PeopleNTech Business Hosting
আমেরিকায় বাংলাদেশি প্রজন্ম: শেকড় ধরে রাখতে পারছে কি?

আমেরিকায় বাংলাদেশি প্রজন্ম: শেকড় ধরে রাখতে পারছে কি?


রুমি কবির: আমার এক বন্ধু সেদিন আমাকে পেয়ে তার দীর্ঘদিনের একটা মনকষ্টের কথা বলছিলেন। বন্ধুটি হতাশার সাথে বললেন, “দেখুন, আমি এই আটলান্টায় বাস করছি প্রায় ২০ বছর ধরে। এই আমেরিকাতেই আমার মেয়েটির জন্ম, আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠছে সে, ওর জন্যে উন্নত শিক্ষা, উন্নত জীবনযাপনের সব রকম ব্যবস্থা, বিনোদন, চলাফেরা, সঠিক চিন্তা চেতনা, আধুনিক দেশের প্রযুক্তি, সমাজ ব্যবস্থা, চিকিৎসা, সুযোগ সুবিধা- এসব কোন কিছুরই কমতি নেই। ও নিজের পরিপাটি ভবিষ্যৎ গড়ার পথচলায় নিশ্চিন্ত মনেই এগিয়ে যাচ্ছে।

অথচ এরপরও একটা গভীর শূন্যতা রয়েছে, যা আমি বা ও’র মা আমরা কেউই পূরণ করে দিতে পারছিনা ব্যস্ত জীবনের কারণে। সেটি ও’র শেকড়। ও’কে আমাদের শেকড়ের কাছে নিয়ে যেতে পারছিনা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা, ভাষা বা সাংস্কৃতিক চেতনাবোধ কোন কিছুর সাথেই পরিচিত করাতে পারছিনা”।

আমি বললাম, “ধন্যবাদ আপনাকে, আপনার ভেতরে অন্তত এই অনুশোচনাটা হচ্ছে, কিন্তু আমাদের প্রবাসীদের এসব নিয়ে তো চিন্তা করারই সময় নেই!”

তিনি আরও বললেন, “আমরা নিজেরা না পারলেও ছেলেমেয়েদেরকে মসজিদে পাঠিয়ে তো ধর্মকর্মটা অন্তত শেখাতে পারছি, কিন্তু ওরা যে বাঙালি, ওদের শেকড় যে বাংলাদেশে এই কথাটি শেখাবে কারা? ওদের অরিজিনাল আইডেন্টিটিকে চিনিয়ে দিতে সংগঠনগুলোর কি কিছুই করার নেই?”

হ্যা, এটাই এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলা ভাষাভাষী অভিভাবকদের একমাত্র উৎকণ্ঠার বিষয়। আসলে

দেখতে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে প্রথম প্রজন্ম হিসেবে আমাদের অনেকটা সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এদেশের অভিবাসন ভিসা পদ্ধতি কিংবা স্টুডেন্ট ভিসা বা অন্যান্য উপায়ে প্রবাসী হয়ে আমরা যারা একদিন গ্রিন কার্ডধারী হয়ে বসবাস শুরু করি, তাদের অনেকের পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেছে অসংখ্য নতুন প্রজন্ম বা কারো কারো ভাষায় দ্বিতীয় প্রজন্ম। দিনে দিনে সময় যতই এগুচ্ছে, ততই এই নতুন প্রজন্মের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে এবং এরা পাশ্চাত্যের সঠিক শিক্ষা-দীক্ষা আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশের মধ্যে থেকে বেড়েও উঠছে আপন গতিতে।

সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়, যেদিন আমাদের এই সন্তানেরা ধীরে ধীরে এদেশের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজেদেরকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে, খাঁটি আমেরিকান হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অফিসে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, রাজনীতিতে এমনকি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসীন হতে সক্ষম হবে। আমরা দেখতেও পাচ্ছি, সেই সুন্দর স্বপ্ন ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও বাস্তবায়ন হতেও শুরু করেছে। কারো কারো সন্তান আজ আমেরিকান মূলধারার কর্পোরেট অফিসে, ব্যবসা বাণিজ্যে ও আইটি সেক্টরে শীর্ষ আসনগুলো দখল করে নিয়েছে মেধা দিয়ে।

বস্তুত জন্মভুমি বাংলাদেশ ছেড়ে যোজন-যোজন দুরের এই প্রবাস জীবনে এসে দ্বিতীয় নিবাস গড়ে তোলার পর   থেকে যখন অনুভব করতে শুরু করেছি যে, এই আমেরিকাই হবে আমাদের স্থায়ী নিবাস, আর তখন থেকেই আমাদের সন্তানদের মসৃণ পথচলার একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখা শুরু করেছি এবং আমরা সেই প্রত্যাশিত স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষাতেই দিন গুনছি এখন।

তাই মেঘে মেঘে অনেক বেলা পার হয়ে যাওয়ার আজকের এই সময়টায় ওই বন্ধুর আক্ষেপের সুরের সাথে সুর মিলিয়ে আমারও প্রশ্ন, বিশ্বের এই সেরা আধুনিক দেশটিতে বেড়ে উঠা আমাদের সন্তানদের জন্যে সত্যিকার অর্থেই আমরা কতটুকু করতে পারছি কিংবা আদৌ কি পারছি ওদেরকে ওদের আত্মপরিচয় বা আইডেন্টিটির সাথে সম্পৃক্ত করিয়ে দিতে ? নাকি সময়ের গহ্বরে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য বা সাংস্কৃতিক গৌরব গাঁথার কথা একদিন এইসব দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছে একটি অপরিচিত অদ্ভুত বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পাবে ? নাকি তাদের শেকড় থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে একদিন এক নামগোত্রহীন আমেরিকান হিসেবে মূলধারায় নিগৃহীত হতে থাকবে ? আমার মনে হয়, এই কয়টি প্রশ্ন যদি একটু গভীরভাবে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা যায়, তাহলে এক নিমেষেই মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার কথা।

আসলে এই বিষয়টিকে আমরা অভিভাবকরা আজকাল কোনভাবেই আমলে নিচ্ছি না বা পরোয়া করছি না। তবে একথা সত্যি যে, আমরা এখনও মনে-প্রাণে বাংলাদেশি হিসেবে এই প্রবাসে নিজেদেরকে ধারণ করতে চাই এবং নির্জলা সত্য এখানেই যে, সেটি সীমাবদ্ধ থাকছে কেবল আমাদের প্রথম প্রজন্মের মধ্যেই অর্থাৎ অভিভাবকদের মধ্যেই। আর একারণে আমরা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গৌরব-গাঁথা বা বাঙালির সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় চর্চা-আদর্শকে বুকে ধারণ করছি এবং নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কর্মসূচিতে নিজেরাই অংশগ্রহণ করে চলেছি নির্লজ্জ স্বার্থপরের মতো। স্বদেশের রাজনীতি চর্চাতেও আমরা কারো চাইতে কম নই।

স্বদেশের মতোই এখানকার গড়ে উঠা রাজনৈতিক দলগুলির নানা কর্মসূচী, সাংগঠনিক তৎপরতা, নেতা হওয়ার নানা লবিং, কৌশলে যুক্ত হওয়া এমনকি দলের মধ্যকার নানা বিভেদ, কোন্দল, অস্থিরতা সব কিছুতেই যোগ দিচ্ছি। ফলে এসব দেখলে মনেই হবে না যে আমরা স্বদেশ থেকে সাত-সমুদ্দর তেরো নদীর পারের একটি ভিন্ন দেশের ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাস করছি।

শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অন্যান্য অভিবাসী জাতি বা প্রবাসীদের মতো আমরাও বাংলাদেশকে, বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে গতিশীল রাখতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তুলছি। স্বদেশের চেতনায় মহান একুশ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বৈশাখী মেলা, বনভোজন, পুনর্মিলনী ইত্যাদি কোন কিছুই বাদ থাকছেনা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা নিয়েও গড়ে উঠছে নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক বা ইস্যু ভিত্তিক সংগঠন। এরাও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটিকে প্রাণচঞ্চল রাখার প্রচেষ্টায় সচেষ্ট। মোট কথা, এর সবই প্রতিফলিত হচ্ছে শুধু আমাদের প্রথম প্রজন্মের মধ্যেই।

আর এজন্যেই খুব লজ্জা ও দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে যে, আমাদের নতুন প্রজন্মের উৎসাহ, আগ্রহ বা স্বতঃস্ফূর্ততা কোনটিই দেখা যাচ্ছেনা বাঙালির এসব কর্মসূচী, চর্চা বা অনুষ্ঠানগুলিতে।

তবে যে একবারেই নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নেই, একথা অস্বীকার করবো না। কোনও কোনও পরিবারে ছেলে- মেয়েরা আমাদের সংস্কৃতিকে, মাতৃভাষা বাংলাকে নিষ্ঠার সাথে ধারণ করে অভাবনীয় সাফল্যও এনেছে। তাদের জীবন যাত্রায় সেটি প্রতিফলিতও হচ্ছে। তবে আফসোস যে, এই হারটা একেবারেই নগণ্য। এই প্রবাসে হাতে গোনা কোনও কোনও সংগঠন নিঃস্বার্থভাবে শিশুকিশোরদেরকে নানা কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টাও করে যাচ্ছে। কেউ কেউ ঘরে নিজেরাই সন্তানদের সময় দিচ্ছেন শেকড়ের সাথে সম্পর্ক তৈরিতে।

এব্যাপারে আমার নিজের দুই তনয়ার কথা একটু বলতে হয়। আমার দুই আত্মজার মধ্যে বড়টি মনজিমা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেও সেই ছয় বছর বয়সে দাদুর কাছে বসে বসে একদিন বাংলা শিখে ফেলেছিল। ২০০২ থেকে ২০১৯ সাল- এই সতেরো বছর পেরিয়ে গেলেও ও’ বাংলাকে এখনও নিজের সত্ত্বায় লালন করছে। ওর দাদু মনোয়ারা কবির আজ বেঁচে নেই। জীবনের অধিকাংশ সময় জামালপুর ও ঢাকায় শিক্ষকতা করে শেষ সময়টায় যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে এসে তার এই নাতনীটিকে বাংলা ভাষা শেখানোর মধ্য দিয়ে হয়তো জীবনের একটি গৌরবোজ্জ্বল কাজ করে যেতে পেরেছেন।

মনজিমা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশন চুকিয়ে মাস্টার্স করার চেষ্টা করছে, কাজও করছে মূলধারায়, কিন্তু বাংলা ভাষায় লেখা বা কথা বলার অভ্যাস আজও রয়েছে অটুট। ও’ বাংলাদেশি কমিউনিটির অনুষ্ঠানে সাবলীল বাংলা ও ইংরেজী- এই দুই ভাষাতে উপস্থাপনাও করে সময় পেলে, একসময় মঞ্চে নৃত্য করেছে- এর চাইতে সুখের খবর আর কি হতে পারে ? ছোট কন্যা মানাফিও মঞ্চে নাচে, আবার বড় বোনের মতো না পারলেও ও’র নিজের চেষ্টায় হাই স্কুলের শেষ প্রান্তে এসেও দেখি মাঝেমধ্যে ভাঙা ভাঙা হরফে বাংলা লেখার প্রাণপণ চেষ্টা করে যায়, অধ্যবসায় দেখি ও’র চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রেও। এইভাবে শুধু আমার পরিবারেই নয়, আমার আশপাশের পরিচিত বেশ কয়েকজন বন্ধুর সন্তানেরা আজ বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক উৎসবে পারফর্ম করছে অতি উৎসাহের সাথে, শেকড় খুঁজে নেয়ার তীব্র আকুতি ওদের মধ্যে।

একবার বাংলাদেশের অসহায় শিশুদের তহবিল সংগ্রহে আটলান্টায় ‘শিশুদের জন্যে শিশুরা’এই শ্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে ডিসিআই, আটলান্টা চ্যাপ্টারের উদযোগে ভিন্নধারার এক কনসার্ট  অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে কম করে হলেও শতাধিক শিশু-কিশোর এক সাথে একই মঞ্চ থেকে পারফর্ম করে আমাদেরকে রীতিমত এনে দিয়েছিল ভিন্ন ধারার চমক। বাংলাদেশের দরিদ্র সহায় সম্বলহীন শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর এই অনুভূতিও যে আমাদের আধুনিক দেশের বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে নাড়া দিতে পারে, সেটাই প্রমাণ করেছে ওদের অংশগ্রহণ থেকে।

আবার আটলান্টায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাধারা আয়োজিত রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী, একুশের অনুষ্ঠান বা অন্য কোনও সংগঠনের আয়োজন হলেও আমাদের শিশু-কিশোররা আগ্রহের সাথে মহান কবি-সাহিত্যিকদের, ভাষা শহীদ বা গুণীজনদের চেনার চেষ্টা করছে। গানের ভেতর, নাচের ভেতর ঢুকে পড়ছে কৌতূহলের সাথে। দর্শক-শ্রোতাদের চিত্ত জয় করছে ওদের সাবলীল পরিবেশনায়। কখনো দেখি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে আবিষ্কার করে নিচ্ছে তাদের ইংরেজী ভাষায় লেখনীতে।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ৬৬ বা ৬৯ এর আন্দোলন কিংবা কিভাবে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা হলেন, কী করেই বা বঙ্গবন্ধু হলেন, একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্যে কিভাবে স্বাধীনতার ডাক দিলেন, দিনে দিনে জাতির এই প্রিয় মানুষটি কিভাবে জাতির পিতা বা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিগণিত হলেন, এধরনের অসংখ্য অজানাকে জানার সন্ধানে কোনও কোনও কিশোর-কিশোরীর চোখে মুখে দেখেছি অনুসন্ধিৎসা। এসব জানতে ওরা তাদের অভিভাবককে একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে মারছে অথবা আধুনিক যুগের গুগল হাতড়াচ্ছে কৌতূহলের সাথে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কসহ কোনও কোনও শহরের কতিপয় বাঙালি একসাথে মিলে স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও চেষ্টা করছেন। এগুলোর সবই আমাদের জন্যে আনন্দের সংবাদ। তবে গড়পড়তায় এই অংশগ্রহণের হার এত নগন্য যে, বড়জোর শতকরা ৩ থেকে ৪ ভাগের বেশি হবে না, যা সত্যিকার অর্থেই হতাশাব্যঞ্জক।

তবে এর পরও কথা থেকেই যায়, ওদের সাথে আমাদের কোনও যোগসূত্রতা তৈরি হচ্ছেনা শেকড়কে শেখাবার জন্যে। ফলে ওদের দু’একজনের সাথে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, কখনো কখনো ওদেরকে আমরা নানা বাংলাদেশি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাতে বাধ্য করছি। কোন কোন কোমলমতি শিশু-কিশোর কি উপলক্ষে বা কিসের উদ্দেশে এসব অনুষ্ঠানে পারফর্ম করছে, সেটা তাদের কাছে অস্পষ্ট অর্থাৎ আমরা অভিভাবকরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে মঞ্চে পাঠিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু তাদেরকে আমার স্বদেশের সংস্কৃতির ওই পারফর্মেন্সের বিষয়বস্তুটি নিয়ে বিস্তারিত কোন কিছু অবহিত করাচ্ছি না বা সে সম্পর্কে শিক্ষা দিতে ভুলে যাচ্ছি।

আর তাই আজ দেখতে পাচ্ছি, একদিকে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসার বহির্প্রকাশ আমরা নিজেরা প্রকাশ করছি বা চর্চা করছি, ঠিক তার উল্টো হারে ঘটে চলেছে ভিন্ন এক আশঙ্কার চিত্র আমাদের উত্তরসূরিদের মাঝে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে এসবের প্রতি তীব্র অনাগ্রহ বা এড়িয়ে চলার এক নৈরাশ্যজনক মানসিকতা। তাই মাঝে মাঝে আশঙ্কা হয় এই ভেবে যে, নতুন প্রজন্মের আইডেন্টিটি বা আত্ম-পরিচয় রক্ষায় আগামীদিনে এরা কঠিন কোনও সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে কিনা।

আশঙ্কাটি কেনই বা হবে না ? এব্যাপারে কয়েকটি ছোটখাটো উদাহরণ দিই। এই যেমন ধরা যাক, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে গেলাম, সেখানে আলোচনা শুনছি একাত্তুরের প্রেক্ষাপটে। বাঙালি জাতি কিভাবে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে শহীদের রক্ত আর মা বোনদের ইজ্জতের বিনিময়ে একটি স্বাধীন জাতির জন্ম দিল, এসব সারগর্ভ আলোচনা শোনার পাশাপাশি আমি নিজেও আলোচনায় অংশ নিচ্ছি। কখনো হয়তো কোন গুণী শিল্পীর দরাজ কণ্ঠের গানও শুনছি। অথচ এরই ফাঁকে আমার পাশের চেয়ারে বসে থাকা সন্তানটি কখন যে আসন ছেড়ে বাইরে গিয়ে একই বয়সী অন্য বন্ধুদের সাথে তাদের ভাষায় মানে ইংরেজিতে, তাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে ভাব বিনিময় করছে, আড্ডায় মেতে ওঠছে কিংবা হৈ চৈ, ছুটাছুটি করছে, আমি কিন্তু টেরও পাচ্ছি না।

এটি কেন হচ্ছে ? আমি অনুষ্ঠানে আসার আগে কখনো আমার সন্তানকে সেই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বলার বা ব্যাখা করার প্রয়োজন মনে করছি না, সেটি কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, নাকি একুশে ফেব্রুয়ারির শ্রদ্ধাঞ্জলি, নাকি নববর্ষের কোন বৈশাখী মেলা- এসব কোন ধারনাই আমার সন্তানটির ভেতরে নেই। মূলত আমার নিজেরই কোন আগ্রহ নেই সন্তানদের কাছে শেয়ার করার ব্যাপারে।

প্রবাসে আমরা যে কাজটি সব চাইতে খারাপ করছি, সেটি হচ্ছে, বাড়িতে ছেলেমেয়েদের সাথে অনর্গল বাংলা ভাষার পরিবর্তে ইংরেজিতে কথা বলে যাচ্ছি। ছেলেমেয়েরা এমনিতেই স্কুলে বা বাইরে তাদের স্বাভাবিক নিয়মে এদেশের ভাষা ইংরেজিতেই কথা বলে থাকে। সেই ক্ষেত্রে কোথায় আমি ছেলে-মেয়েদেরকে বাড়িতে বাংলা ভাষায় কথা বলার বিষয়টি বাধ্যতামুলক করে দেব, সেটি না করে আমি নিজেই ইংরেজী ভাষার পাণ্ডিত্য দেখাচ্ছি ওদের সাথে। এর চাইতে লজ্জার আর কি থাকতে পারে? অথচ আমি হলফ করে বলতে পারি, ঘরে ছেলে-মেয়েদের সাথে বাংলা ভাষায় কথা বললে ওদের মধ্যে কোনও না কোনওভাবে বাংলার প্রতি মমত্ববোধটুকু তৈরি করানো সম্ভব। কেননা তারা কোনও না কোনওভাবে জানে যে, ওরা এদেশে জন্ম গ্রহণ করলেও ওদের পূর্বপুরুষের শেকড় বাংলাদেশে।

আরও একটা ঘটনার কথা বলি। কয়েক বছর আগে আমার বন্ধুর দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়া এক কন্যার সাথে বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলছিলাম গাড়ি চালানোর সময়। এক পর্যায়ে বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কী হয়েছিল জানতে চাইলে মেয়েটি একটু ভেবে-চিন্তে খুব ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্কারভাবে বলছিল যে, সেসময় স্বাধীনতার জন্যে বাঙালিরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং কিছু মানুষ পাকিস্তানিদের গুলিতে তখন মারা গিয়েছিলো।

সেদিন আমি এধরনের উত্তর শুনে হতবাক হয়েছিলাম। তার সাথে আর কোন কথা বলার সাহস পাইনি। পরে ভেবে দেখেছি যে, এখানে অবাক হবার তো কিছুই ছিলনা ! কেননা আমরা অভিভাবকরা জীবন জীবিকা ও ডলারের পেছনে এতটাই ব্যস্ত সময় কাটাই যে, সন্তানদের কাছে পূর্ব-পুরুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলার বা গল্প করার বিন্দু মাত্র সময়ও বের করতে পারিনা। কাজেই ওর কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আর কি আশা করতে পারি? অথচ আমরা কোনভাবে যদি ওদের ভেতরে নিজেদের আইডেন্টিটি বা শেকড়কে একটু একটু করে সম্পৃক্ত করাতে পারি, তবে ওরা নিজেরাই অন লাইনে, গুগলে বা নানা মাধ্যমে ঢুকে গিয়ে ওদের পূর্ব-পুরুষের সব কিছুই আত্মস্থ করে নিতে পারে। এই বিশ্বাসটি আমাদের এখনও আছে।

আরেকটা ব্যাপার লক্ষ করেছি যে, আমাদের কমিউনিটির সংগঠনগুলোর নানা তৎপরতা নিয়েও নতুন প্রজন্মের মধ্যে একধরনের বিরূপ মানসিকতা আজকাল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মূলত যেসমস্ত ছেলেমেয়েরা বর্তমানে স্কুল পেরিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছে অর্থাৎ মানসিকভাবে পরিপক্কতা এসেছে , তাদের মধ্যেই এধরনের মানসিকতা বেশি। এদের মতে, বাবা-মাদেরকে খুশি করার জন্যেই তারা বাঙালিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলিতে অংশগ্রহণ করে থাকে। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশি কমিউনিটির বেশির ভাগ আংকেল সংগঠন করতে গিয়ে একে অপরের নিন্দা বা পাল্টাপাল্টি করার বিষয়ে খুবই তৎপর থাকেন। এক দলের সাথে আরেক দলের হিংসাত্মক আচরণ তাদের কাছে একটি অস্বস্তিকর ও লজ্জার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এসব কর্মসূচী থেকে তারা দূরে থাকতেই পছন্দ করে।

এই হচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্মের হালচাল। কিন্তু এই চিত্রটি তো ফুটে ওঠার কথা ছিল না ওদের চিন্তা চেতনায় ! ওরা জন্মগত সূত্রে এবং অফিসিয়ালি আমেরিকান হলেও ওদের তো বেড়ে উঠার কথা খাঁটি বাংলাদেশি না হোক, অন্তত বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক হিসেবে, যেখানে বাঙালি সংস্কৃতির অন্তত একটা সহনীয় মাত্রা ওদের চেতনায় লালিত হবে!

আমার মনে পড়ে, কয়েক বছর আগে এক বন্ধু স্বদেশের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে টেলিফোনে কথা বলছিলেন। অভিবাসী হয়ে সন্তান স্ত্রী নিয়ে এদেশে আসার কয়েক বছরের মধ্যেই তার সন্তানটি যে বাংলা ভুলে গিয়ে ইংরেজী ভাষায় আমেরিকানদের মতো অনর্গল কথা বলছে- এই প্রশংসায় মুখরোচক গল্পের খই ভাজতে শুরু করেছিলেন। এই যদি হয় আমাদের মানসিকতা, তাহলে কি করে আমাদের উত্তরসূরিরা সঠিক দিক-নির্দেশনা খুঁজে পাবে ?

অনেকেই অবশ্য ছেলেমেয়েদেরকে বাংলা শেখানো নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রবাসের সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দোষারোপ করতে শুরু করেন। তারা বলেন, এটি নাকি নেতা, সংগঠক বা সংগঠনের কাজ। তাদের মতে, সংগঠনের নেতাগন শুধুমাত্র নিজেদের নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে কিংবা নাচ, গান, নামী-দামী শিল্পীদের কনসার্ট করা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, এরা নির্বাচনের আগে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেসব বাস্তবায়ন করেন না। সংগঠনের উদ্যোগে বাংলা স্কুল চালুর কথা অনেকেই বলে থাকেন, কিন্তু পড়ে বেমালুম ভুলে যান। অথচ সংগঠনের মাধ্যমে বাংলা স্কুল হলে নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করানো সহজ হতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস।

যুক্তিটি একদম সঠিক হলেও অভিভাবকদেরকে নিজ পরিবারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবার আগে এগিয়ে আসা জরুরী বলে আমি মনে করি। বাড়িতে বাংলা ভাষা থেকে শুরু করে পুরোদমে বাঙালিয়ানা পরিবেশটি তৈরি করা সবার আগে জরুরী। এরপর সাংগঠনিক তৎপরতা আরও এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। এতে করেই আমার বিশ্বাস, ছেলে-মেয়েরা তাদের আইডেন্টিটিকে ধরে রাখতে সক্ষম হতে পারে।

প্রবাসে সংগঠনগুলির ভুমিকার ব্যাপারে একটি কথা মনে পড়ে গেল। গত বছর বাংলাধারা আয়োজিত মহান একুশের এক অনুষ্ঠানে আমার সুযোগ হয়েছিল প্রবাসে নতুন প্রজন্মের আত্মপরিচয়কে ধরে রাখার প্রসঙ্গ নিয়ে আমার চিন্তা-ভাবনাগুলো উপস্থাপন করার। সেখানে আমি আশার আলো দেখতে পেয়েছিলাম অভিভাবকদের মধ্যে। ভীষণ মনোযোগের সাথে দর্শক-শ্রোতা আমার পঠিত নিবন্ধটি শোনেন এবং একের পর এক বক্তা এসে আবেগে আপ্লুত হয়ে প্রবাসে সন্তাদেরকে মাতৃভাষা বাংলা শেখানোর ওপর দৃঢ় অঙ্গিকারের কথা উচ্চারণ করেন। অনুষ্ঠানে জর্জিয়ায় বাংলাদেশি শিশু কিশোরদের জন্যে একটি বাংলা শেখার পাঠশালা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।

সেসময় বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে আসা জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী এস আই টুটুল অতিথি হয়ে যোগ দিয়েছিলেন। আহ্বান জানিয়েছিলেন সবার আগে নিজের ঘর থেকে সন্তানদের এই বাংলা ভাষা শেখানোর শুভকাজটি করার জন্যে। তিনি বলেছিলেন, “আসুন, আমরা সবাই মিলে নিজের সন্তানকে সবার আগে ‘ড্যাড’ থেকে ‘বাবা’ এবং ‘মাম থেকে ‘মা’ বলা শেখানো শুরু করি”। টুটুল বাংলাদেশে বাস করলেও আটলান্টায় নতুন প্রজন্মকে বাঙালির শেকড়ের সাথে সম্পৃক্ত করানোর এই প্রচেষ্টায় যে কোন সহযোগিতায় পাশে দাঁড়াবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

মনে পড়ে, এর কয়েকমাস পরই এখানকার প্রবাসীদের মূল সংগঠন জর্জিয়া বাংলাদেশ সমিতির নির্বাচন হলো। বিজয়ী প্রার্থীদের অনেকগুলো প্রতিশ্রুতির মধ্যে বাংলা স্কুল চালুর বিষয়টিও ছিল অন্যতম। অথচ আফসোসের বিষয় যে, অতীতেও সমিতির বেশ কয়েকটি কমিটি এধরনের কথা দিয়েও শেষমেশ কথা রাখেনি। তাই এবারের নবনির্বাচিত কমিটিও যখন তাদের ছয় মাসের অগ্রগতি নিয়ে কয়েকদিন আগে সাংবাদিক সম্মেলন করছিলো, তখন জনৈক সদস্য বাংলা স্কুল স্থাপনের প্রতিশ্রুতির কথাটি মনে করিয়ে দিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বাংলা স্কুলটি আদৌ তারা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কিনা। উত্তরে নেতৃবৃন্দ দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন, একটি বিশাল জমির উপর বাংলাদেশ ভবণ নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে, কাজেই ওই ভবনেই একটি বাংলা স্কুলের জন্যে কক্ষ বরাদ্দ থাকবে, যেটি একটি পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। আসলে স্কুলটি না হওয়া পর্যন্ত প্রবাসিরা আর বিশ্বাসই করতে পারছেন না। তবে আমি আশাবাদী, ওদের ইচ্ছাশক্তির জোর যদি প্রবল হয়, যদি থাকে বাংলা ভাষা বা সংস্কৃতির প্রতি মমত্ববোধ তাহলে হতেও পারে এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা।

আমার ধারণা, আমরা নিজেরা যতই দেশপ্রেম নিয়ে বক্তৃতা বিবৃতি বা সাংগঠনিক তৎপরতায় সক্রিয় থাকি না কেন, একই সাথে নতুন প্রজন্মকেও সেই চেতনাবোধে উজ্জীবিত করতে না পারলে প্রবাসে বাঙালির শেকড় ঠিক ঠিকই একদিন মুছে যেতে বাধ্য হবে এবং আমাদের সন্তানেরা আইডেন্টিটি সংকটের মুখোমুখি হয়ে অনিশ্চয়তার গহ্বরে তলিয়ে যেতে থাকবে।

অথচ আমাদের আশপাশেই একবার তাকাই না কেন? এই প্রবাসে আমাদের আশেপাশের অন্যান্য অভিবাসী জাতির দিকে যদি লক্ষ্য করি, তবে দেখবো, যুগ যুগ ধরে এইসব ভিনদেশি অভিবাসী গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাষাকে তাদের পরিবারের নতুন প্রজন্মের মাঝেও লালন করে যাচ্ছে। ধরুন না স্প্যানিশ, আইরিশ, আফ্রিকান, জার্মান কিংবা ইহুদী জাতির অভিবাসীদের কথাই ! এরা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাস করেও নিজ নিজ সংস্কৃতি ও ভাষাকে সন্তানদেরকে শিখিয়ে তাদের আইডেন্টিটিকে ধরে রাখতে পারছে। আবার খাঁটি আমেরিকান হিসেবেও এরা কিন্তু অনেক এগিয়ে। আর আমরা নির্বোধ বাংলাদেশি অভিবাসীরা নিজেদের সংস্কৃতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে পরেরটাকেই মূলধন করে গর্ববোধ করছি, ধন্য হয়ে যাচ্ছি।

তবে গত কয়েকদিনের ব্যবধানে জর্জিয়া রাজ্যের শিশু-কিশোরদের বাংলা শেখানোর লক্ষ্যে একটি উইক-এন্ড ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার একটি আনন্দ সংবাদ আমাদেরকে আশার আলোর দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এটির ধারাবাহিকতা এবং সেইসাথে সর্বস্তরের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান শহর এই আটলান্টায় প্রবাসী বাঙালির দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে।

প্রতি রোববার সকাল ১০ টা থেকে দুই ঘণ্টার জন্যে স্থানীয় জিমি কার্টার রোডের গ্লোবাল মলের ১১১ নম্বর শ্রেণিকক্ষে বাংলা ভাষার এই ক্লাস চলবে বলে জানানো হয়েছে। মুলত এই অঞ্চলের শিশু কিশোরদেরকে বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চায় বিকশিত করে তুলতেই ‘বাংলা ভাষা ও শিল্পকলা কেন্দ্র’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছে। শুধু বাংলা ভাষা শিক্ষাই নয়, সেইসাথে এখানে সংগীত ও নৃত্যকলার ওপরও ছাত্র ছাত্রী ভর্তি করানো হচ্ছে। মনে পড়ে, আটলান্টায় এর আগে ২০০৩ সালে একবার বাংলা স্কুল চালু হয়েছিল বেশ উৎসাহ নিয়ে। কিন্তু পরে দুইবছরের মধ্যেই তা আবার মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কাজেই দীর্ঘ সময় পর এবার বাংলা শিক্ষার এই সুযোগ সৃষ্টির খবরটি নিঃসন্দেহে কমিউনিটিতে আলোড়ন তুলতে পেরেছে।

সবশেষে একটি কথা না বলে পারছিনা যে, আমরা অভিভাবকরা নতুন প্রজন্মকে আমাদের শেকড়ের কাছাকাছি নিতে না পারলেও আদর্শ মুসলিম নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জে সফল হতে চলেছে প্রবাসের মসজিদগুলো। এই কয়েকবছর আগেও আটলান্টায় ডাউন টাউনের আল ফারুক মসজিদ ছাড়া জুম্মা নামাজ পড়ার কোনও জায়গা ছিলনা। আর আজকের দিনে আটলান্টায় পঞ্চাশটিরও বেশি মসজিদে নিয়মিত নামাজ, রোজার সময়ে তারাবি এবং সেইসাথে ধর্মীয় চর্চা হচ্ছে। আমরা অভিভাবকরা ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ারও সময় পাইনা বলে মসজিদের শিক্ষক ও ইমাম সাহেবগণই আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা দিয়ে আমাদেরকে হেফাজত করেছেন।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, মাল্টি কালচারের এই আধুনিক সভ্য দেশে এইভাবে সকল ধর্মের এবং সকল সাংস্কৃতিক চেতনার নাগরিকদের নিজ নিজ আইডেন্টিটিকে ধরে রাখার যে পূর্ণমাত্রায় স্বাধীনতা রয়েছে, একথা কারো অজানা নয়। তাহলে আমাদের সন্তানদের আইডেন্টিটি রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা কেন ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছিনা? আসুন না, এখনও সময় আছে, আমরা সবাই মিলে যার যার অবস্থান থেকে একবার চেষ্টা করেই দেখি না! ঘনকালো মেঘের আবরণ কেটে গিয়ে সোনাঝরা রোদের মতো স্বপ্নপূরণের সফলতা তো এভাবেই সম্ভব!


Ads